বিশ্বের জলবায়ু ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে সক্ষম আবহাওয়াগত ঘটনা এল নিনো আবারও শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোসফেরিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)। এর ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়া পরিস্থিতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবারের এল নিনো অতীতের অনেক রেকর্ড ছাড়িয়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে বন্যা, খরা, তাপপ্রবাহ, দাবানল এবং খাদ্যসংকটের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এটি গত ৭৫ বছরের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হতে পারে। বিশেষ করে আফ্রিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল এবং এশিয়ার কিছু অংশে চরম খরা ও বন্যার আশঙ্কা বাড়ছে। এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয়, যার ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায় এবং বৈশ্বিক আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন আসে। সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি গড়ের তুলনায় সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি বাড়লে সেটিকে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে ধরা হয়।
আন্তর্জাতিক আবহাওয়া মডেলের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শেষ ভাগ এবং ২০২৭ সালের শুরুতে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা ২.৫ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি পর্যন্ত উঠতে পারে, যা নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করতে পারে। এর আগে ১৯৮২-৮৩ সালের এল নিনো ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী, যখন তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় প্রায় ২.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত। এবারের পরিস্থিতি সেই রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনো সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল নয়, তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রভাব আরও তীব্র হয়। অতীতেও দেখা গেছে, শক্তিশালী এল নিনোর পরবর্তী বছরগুলো বৈশ্বিক তাপমাত্রা রেকর্ড ছুঁয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকা ও সাহেল অঞ্চল সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। খরা ও পরবর্তী অতিবৃষ্টির কারণে অনেক অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ইতিমধ্যে যুদ্ধ, খাদ্যসংকট ও অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশগুলো—যেমন সুদান, সোমালিয়া, দক্ষিণ সুদান, চাদ, ইকুয়েডর, ভেনেজুয়েলা ও হাইতি—আরও গভীর মানবিক সংকটে পড়তে পারে। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও আগাম প্রস্তুতি, পানি সংরক্ষণ, খরাসহিষ্ণু ফসল উৎপাদন এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বিশ্বব্যাপী এই নতুন জলবায়ু ঝুঁকি সামনে রেখে দেশগুলোকে এখনই প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।