মানুষ শারীরিকভাবে প্রকৃতির সবচেয়ে দুর্বল প্রাণীদের একটি হলেও, সামাজিক সহযোগিতা, জ্ঞান বিনিময় এবং প্রজন্মান্তরে অভিজ্ঞতা হস্তান্তরের ক্ষমতাই তাকে পৃথিবীর শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। সভ্যতার মূল শক্তি ছিল মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস ও একতাবদ্ধ হওয়ার সক্ষমতা। কিন্তু ইতিহাসজুড়ে দেখা যায়, এই ঐক্যই বহু সময় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ফলে সমাজে বিভাজন তৈরি করতে ভাষা, পরিচয় ও আবেগকে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা গেছে, যা আধুনিক কালে অনেকেই “কগনিটিভ ওয়ারফেয়ার” বা মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
এই ধারণা অনুযায়ী, যুদ্ধ শুধু অস্ত্র বা ভূখণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও ধারণাকে প্রভাবিত করাও এক ধরনের কৌশলগত যুদ্ধ। বারবার নির্দিষ্ট বার্তা প্রচারের মাধ্যমে মানুষের মনে একটি ধারণাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব—এমনই দাবি করা হয় মনোবিজ্ঞানের কিছু তত্ত্বে। লেখকের মতে, ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে “আমরা বনাম তারা” ধরনের পরিচয় তৈরি করে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করা হয়েছে। জাতিগত, আঞ্চলিক বা সামাজিক পরিচয়ের পার্থক্যকে বড় করে তুলে ধরে পারস্পরিক সন্দেহ ও দূরত্ব তৈরি করার অভিযোগও তোলা হয় কিছু রাজনৈতিক ও ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে।
উপনিবেশিক শাসনামলে “Divide and Rule” নীতির মাধ্যমে সমাজকে বিভক্ত করার উদাহরণ ইতিহাসে পাওয়া যায় বলে দাবি করা হয়। আদমশুমারির মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে পরিচয়ভিত্তিক বিভাজনকে দৃশ্যমান করে তোলে বলে মত রয়েছে। এই ধারাবাহিকতার ফল হিসেবে পরবর্তীতে বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ও সহিংসতা দেখা দেয়, যার চরম রূপ ছিল ১৯৪৬ সালের কলকাতার সহিংস ঘটনা, যেখানে বিপুল প্রাণহানি ও বাস্তুচ্যুতির ঘটনা ঘটে।
তবে একই সঙ্গে ইতিহাসে এটিও দেখা যায় যে, বহু শতাব্দী ধরে সাধারণ মানুষ ধর্ম, জাতি ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের মধ্যেও জীবনযাপন করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক বিশ্বে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিভাজনমূলক বয়ানকে অতিক্রম করে মানবিক ঐক্য, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সমাজকে এগিয়ে নেওয়া। কারণ প্রযুক্তি ও যোগাযোগের এই যুগে তথ্য যেমন দ্রুত ছড়ায়, তেমনি বিভ্রান্তিও দ্রুত বিস্তার লাভ করতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, মানবসভ্যতার টিকে থাকা ও অগ্রগতির মূল ভিত্তি ছিল সহযোগিতা ও ঐক্য। সেই ঐতিহ্যকে ধরে রাখাই আধুনিক সমাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।