এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নতুন করে কঠোর চাপে পড়েছে। সরকারি নিয়ন্ত্রণ, গ্রেপ্তার, সেন্সরশিপ, অনলাইন নজরদারি, মামলা ও সহিংসতার কারণে সাংবাদিকরা ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও সাংবাদিক সংগঠনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, বহু দেশে সংবিধান ও নীতিগতভাবে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও বাস্তবে সাংবাদিকদের ওপর চাপ ও আত্মসেন্সরশিপ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও দুর্নীতিবিষয়ক সংবাদ পরিবেশনে সাংবাদিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের তথ্যমতে, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় কিছু উন্নতির ইঙ্গিত থাকলেও মিয়ানমার, পাকিস্তান, ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান ও ফিলিপাইনকে এখনো উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, সৌদি আরব ও সিরিয়ার পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফগানিস্তানে কঠোর নিয়ন্ত্রণ—
আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের অধীনে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা আরও সংকুচিত হয়েছে। আফগান জার্নালিস্ট সেন্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ২০০-এর বেশি হুমকি, গ্রেপ্তার ও সেন্সরশিপের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের কার্যক্রম সীমিত করা এবং সম্প্রচার বন্ধের ঘটনাও ঘটেছে বলে জানা যায়। জাতিসংঘও আফগান সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি নিয়ে ভিন্ন চিত্র—
বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিল সময়ে বড় ধরনের সাংবাদিক হত্যার ঘটনা না ঘটলেও আত্মসেন্সরশিপ ও সংবাদ প্রবাহে সীমাবদ্ধতার অভিযোগ রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতির কথা জানানো হয়েছে। তবে বিভিন্ন সময় সাংবাদিকদের হয়রানি ও মামলা সংক্রান্ত অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চীন ও ভিয়েতনামে কঠোর নিয়ন্ত্রণ—
চীনে শতাধিক সাংবাদিক কারাবন্দি রয়েছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার দাবি। রাজনৈতিক ও মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন কঠোর নজরদারির মধ্যে রয়েছে। ভিয়েতনামেও স্বাধীন সাংবাদিকতা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ বলে পর্যবেক্ষকদের মত।
পাকিস্তান ও ভারতে চাপ—
পাকিস্তানে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সাইবার আইনের কারণে সাংবাদিকদের কাজের পরিবেশ সংকুচিত হয়েছে। অন্যদিকে ভারতে রাষ্ট্রদ্রোহ, মানহানি ও তথ্যপ্রযুক্তি আইনে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিয়ানমার ও মধ্যপ্রাচ্যে ঝুঁকি—
মিয়ানমারে সামরিক শাসনের কারণে স্বাধীন সাংবাদিকতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। সৌদি আরব, ইরান ও সিরিয়াতেও সাংবাদিকদের ওপর নজরদারি, গ্রেপ্তার ও ভয়ভীতির অভিযোগ রয়েছে।
ফিলিপাইন ও কম্বোডিয়ায় সহিংসতা—
ফিলিপাইনে সাংবাদিক হত্যা ও হামলার ঘটনা বাড়ছে। কম্বোডিয়ায়ও স্বাধীন সাংবাদিকদের ওপর চাপ, গ্রেপ্তার ও কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।
উত্তর কোরিয়া: সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত তথ্যব্যবস্থা—
উত্তর কোরিয়ায় স্বাধীন সাংবাদিকতার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যম ছাড়া অন্য সব তথ্যপ্রবাহ নিষিদ্ধ, যা দেশটিকে বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর তথ্য নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এশিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যা গণতন্ত্র ও স্বচ্ছতার ওপর দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে।
সূত্র: আন্তর্জাতিক সাংবাদিক সংগঠন ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনসমূহ