ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোরবানির পশুর চামড়া শুধু একটি পার্শ্বসম্পদ নয়, বরং এটি একটি সামাজিক কল্যাণমূলক সম্পদ, যা দরিদ্র, এতিম ও জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের নির্দেশনা রয়েছে। ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী এই চামড়া বিক্রি করে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার বা কসাইয়ের পারিশ্রমিক হিসেবে প্রদান করা বৈধ নয়। ফলে এটি সমাজে সম্পদের পুনর্বণ্টন ও দারিদ্র্য বিমোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ৯০ লাখ থেকে ১ কোটি পশু কোরবানি হয়, যার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ কাঁচা চামড়া উৎপন্ন হয়। সঠিক ব্যবস্থাপনায় এই খাত থেকে বছরে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক অবদান রাখা সম্ভব হলেও বাস্তবে এটি নানা সংকটের মুখে রয়েছে। বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে চামড়ার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে, ফলে অনেক সময় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও প্রান্তিক সংগ্রাহকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নত ব্যবস্থাপনা থাকলে কোরবানির চামড়া খাত বছরে ৪ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থনৈতিক অবদান রাখতে সক্ষম। তবে সংরক্ষণ ঘাটতি, মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ দুর্বলতা এই সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। বর্তমান পরিস্থিতি উন্নয়নে সরকার তৃণমূল পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে, যাতে মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা দক্ষভাবে চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন। পাশাপাশি সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার (সিইটিপি) সংস্কার, পরিবেশগত মান উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মান অর্জনের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশের চামড়ার আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য তুলনামূলকভাবে কম হওয়ায় শিল্পটি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছে। তবে সরকার রপ্তানি সহায়তা, করসুবিধা এবং প্রযুক্তি উন্নয়নের মাধ্যমে খাতটিকে আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে ঋণ সুবিধা সহজীকরণ করা হয়েছে, যাতে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও কার্যকর হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্যানারি শিল্পে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং ডিজিটাল সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের চামড়া খাত বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম প্রধান উৎসে পরিণত হতে পারে। একই সঙ্গে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার ও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনের অংশ।
উপসংহারে বলা যায়, সমন্বিত নীতি, সুশাসন, প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে কোরবানির চামড়া খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলতে সক্ষম।
লেখক সূত্র: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট