খার্গ দ্বীপ পারস্য উপসাগরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপন। এটি শুধু ইরানের জন্য নয়, বরং বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্যও কেন্দ্রবিন্দু। দ্বীপটি হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থান করছে, যা বিশ্বের তেলের প্রধান পরিবহন পথ। এ কারণে খার্গ দ্বীপের কার্যক্রমে গ্লোবাল তেল বাজার সরাসরি প্রভাবিত হয়।
ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক প্রেক্ষাপট:
১৯৬০-এর দশকে ইরান দ্বীপটিকে তেল রপ্তানির কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার শুরু করে।
ইরান-ইরাক যুদ্ধে দ্বীপটি বহুবার আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
১৯৯০-এর দশক থেকে আধুনিকীকরণ প্রকল্পের মাধ্যমে স্টোরেজ ট্যাংক, জেটি, পাইপলাইন এবং সমুদ্রপথের গভীরতা উন্নত করা হয়।
ভৌগোলিকভাবে দ্বীপটি মূলত প্রবাল দ্বারা গঠিত, যা বড় ট্যাংকার গ্রহণে উপযোগী।
বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তায় ভূমিকা:
হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ২০–২১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল পরিবাহিত হয়, যা বৈশ্বিক সরবরাহের প্রায় ২০%।
খার্গ দ্বীপের মাধ্যমে দৈনিক ১৫–২০ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়, যা ইরানের মোট রপ্তানির ৮০–৯০%।
সম্ভাব্য আক্রমণ বা সংঘাত আন্তর্জাতিক বাজারে দাম ৮–২৫% পর্যন্ত বৃদ্ধি করতে পারে।
সম্ভাব্য সংঘাতের প্রভাব:
তেলের সরবরাহ ব্যাহত হলে এশিয়ার বড় আমদানিকারক দেশ যেমন চীন, ভারত, জাপান প্রভাবিত হবে।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাবে, বিদ্যুৎ ও পরিবহন খাতের ব্যয় বাড়বে।
খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাবে।
বিনিয়োগ ও শেয়ারবাজারে অস্থিরতা দেখা দেবে, উৎপাদননির্ভর শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট:
দেশের মোট জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৯৫% আমদানিনির্ভর।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬৫% জ্বালানি আমদানি থেকে আসে।
২০২২-২৩ অর্থবছরে জ্বালানি আমদানিতে খরচ প্রায় ৪৭–৪৮ হাজার কোটি টাকা।
তেলের মূল্য ১০–২০% বৃদ্ধি পেলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সরবরাহ সংকট বিদ্যুৎ ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করবে, খাদ্য মূল্য বৃদ্ধি ঘটাবে এবং GDP প্রবৃদ্ধি কমাতে পারে।
প্রস্তাবিত সমাধান ও প্রস্তুতি:
বিকল্প জ্বালানি উৎস এবং আমদানির রুট বিস্তৃতি বৃদ্ধি।
দেশের অভ্যন্তরীণ তেল ও জ্বালানি মজুত বৃদ্ধির মাধ্যমে সরবরাহ বিঘ্ন মোকাবিলা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি—সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্প্রসারণ।
শিল্প খাতে জ্বালানি দক্ষতা বাড়িয়ে খরচ কমানো।
বৈদেশিক বিনিময় রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং কৌশলগত হেজিং।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সংলাপ এবং বৈশ্বিক তেলের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা।
উপসংহার:
খার্গ দ্বীপ কেবল আঞ্চলিক নয়, বরং বিশ্বজুড়ে তেল সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। দ্বীপে সম্ভাব্য সংঘাত বাংলাদেশসহ বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে কৌশলগত প্রস্তুতি, বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এগুলো গ্রহণ করলে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, সরবরাহ শকের প্রভাব সীমিত হবে এবং মূল্যস্ফীতি ও শিল্প ক্ষতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট