দেশে কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থা নানা কাঠামোগত সংকটে জর্জরিত হয়ে পড়েছে। শিক্ষক সংকট, আধুনিক উপকরণের অভাব, পুরোনো কারিকুলাম এবং দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে পুরো খাতেই তৈরি হয়েছে স্থবিরতা।দেশজুড়ে ১২ হাজারের বেশি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার হার প্রায় ৪৪ শতাংশ। একইসঙ্গে বিভিন্ন পলিটেকনিক, মনোটেকনিক ও কারিগরি স্কুল-কলেজে শিক্ষক পদের প্রায় ৭৩ শতাংশই শূন্য। শুধু তাই নয়, জনশক্তি ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান ব্যুরোর অধীন কারিগরি প্রতিষ্ঠানগুলোতেও প্রায় ৬০ শতাংশ শিক্ষক পদ খালি। অনেক প্রতিষ্ঠানে এক শিফটের শিক্ষক দিয়েই দুই শিফট চালানো হচ্ছে, যা শিক্ষার মানকে আরও দুর্বল করছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত ল্যাবরেটরি নেই, আর যেখানে আছে সেখানেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অভাব। বেসরকারি কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অবস্থা আরও নাজুক। ৩৮৭টি বেসরকারি পলিটেকনিকের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি কার্যকরভাবে শিক্ষা কার্যক্রম চালাতে পারছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণের অভাব, বাজারের চাহিদার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কারিকুলাম এবং উচ্চশিক্ষার সীমিত সুযোগের কারণে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। ফলে প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক আসন ফাঁকা থাকছে। শিক্ষাবিদরা বলছেন, শিক্ষার্থীরা প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক শিক্ষা পাচ্ছে না এবং ল্যাবরেটরি সুবিধাও যুগোপযোগী নয়। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিকস, ইন্টারনেট অব থিংস ও বায়োটেকনোলজি কারিগরি পাঠ্যক্রমে যথেষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তারা আরও মনে করেন, সনাতন কাঠামোর কারণে বাংলাদেশের ডিপ্লোমা ডিগ্রি আন্তর্জাতিক মানে পিছিয়ে আছে, যার ফলে চাকরি পেলেও বেতন ও সুযোগ-সুবিধা কম। এদিকে সরকার কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষাকে পুনর্গঠনের উদ্যোগের কথা বলছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে কারিগরি শিক্ষাকে ঢেলে সাজানো এখন সময়ের দাবি।
একইসঙ্গে বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পড়াশোনা শেষ করার আগেই ঝরে পড়ছে, যা পুরো ব্যবস্থার দুর্বলতাকে আরও স্পষ্ট করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা না গড়ে তুলতে পারলে আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হবে।
সব মিলিয়ে অবকাঠামো সম্প্রসারণ হলেও মানোন্নয়ন না হওয়ায় কারিগরি শিক্ষা খাত এখন বড় ধরনের সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।
সূত্র: বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড