যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হলেও দেশটির সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা সম্ভব হয়নি। বরং হরমুজ প্রণালিতে শক্ত অবস্থান নিয়ে ইরান এখন পুরো বিশ্ব অর্থনীতিকে এই যুদ্ধের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, দুই সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী বিমান যুদ্ধের পর ইরান বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ব্যাহত করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গর্ব করা উপসাগরীয় দেশগুলোও এখন বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে মার্কিন-ইসরায়েল হামলার প্রথম দিন তেহরানের আকাশে যে ধোঁয়া দেখা গিয়েছিল, দুই সপ্তাহ পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ নিয়েছে। কয়েক বছরের গোয়েন্দা তৎপরতার পর তেহরানের একটি আবাসিক এলাকায় হামলা চালিয়ে খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, রাষ্ট্র বনাম রাষ্ট্র সংঘাতে এমন কৌশল খুব কম ক্ষেত্রেই কার্যকর হয়। ইরানও দ্রুত নতুন সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দিয়ে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করেছে। বিকেন্দ্রীকৃত ‘মোজাইক প্রতিরক্ষা’ কৌশলের কারণে দেশটির সামরিক কমান্ডও ভেঙে পড়েনি।
আলী ভায়েজ বলেন, কিছু সিনিয়র নেতা নিহত হলেও ইরানের শাসনব্যবস্থা এখনো অটুট রয়েছে। তার মতে, তেহরান তিন স্তরের কৌশল অনুসরণ করছে—টিকে থাকা, পাল্টা আঘাতের সক্ষমতা বজায় রাখা এবং যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা। এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা দুবাইয়ের মেরিনা ও সাগরে থাকা তেলবাহী ট্যাঙ্কার পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। একই সঙ্গে লেবাননে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলাও চলছে।
সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে হরমুজ প্রণালি ঘিরে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ইরান প্রায় পুরো প্রণালিটি বন্ধ করে দেওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে গেছে। এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে বাংলাদেশ ও নাইজেরিয়ার মতো দেশেও পড়েছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি রেশনিং শুরু হয়েছে, বিমান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে এবং অনেক বিদেশি উপসাগরীয় অঞ্চল ছাড়ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প–এর জন্যও বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। কারণ জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে, বিশেষ করে আসন্ন কংগ্রেস নির্বাচনের আগে। তবে ইরানও দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন অনেক গবেষক। তাদের মতে, অর্থনৈতিক চাপ বাড়তে থাকলে দেশটির সরকার টিকে থাকলেও অর্থনীতি গুরুতর সংকটে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। বরং সংঘাতের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিশ্ব অর্থনীতিতেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।