ফরিদপুরের সালথা উপজেলার মাঝারদিয়া বাজারের পুকুরপাড়ে পড়ে আছে একটি ছোট কাঠের পিঁড়ি। দেখতে সাধারণ হলেও এই পিঁড়ির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এক মানুষের দীর্ঘ ৬৬ বছরের শ্রম আর জীবনের গল্প। সেই পিঁড়িতেই বসে এখনও মানুষের চুল-দাড়ি কাটেন ৮৭ বছর বয়সী অকিল শীল। সোমবার বিকেলে বাজারের পুকুরপাড়ে দেখা যায়, মনোযোগ দিয়ে একজন গ্রাহকের চুল কাটছেন তিনি। সামনে অপেক্ষা করছেন আরও কয়েকজন। কেউ দাঁড়িয়ে, কেউ আবার ধৈর্য ধরে সিরিয়ালে বসে আছেন। যেন সময়ের স্রোতের মধ্যেও টিকে আছে পুরোনো এক আস্থা।
সময়ের সঙ্গে বাজারে আধুনিক সেলুন এসেছে, ঝকঝকে চেয়ার আর বড় আয়নার দোকান হয়েছে। কিন্তু অকিল শীলের কর্মস্থল বদলায়নি। হাটের দিনে আজও তিনি পুকুরপাড়ে এসে সেই পুরোনো পিঁড়িতে বসেন। হাতে থাকে বহু বছরের সঙ্গী কাঁচি আর ক্ষুর। অকিল শীলের বাড়ি নগরকান্দা উপজেলার চৌমুখা এলাকায়। বাবা হরিবদন শীলের কাছ থেকেই ছোটবেলায় নাপিতের কাজ শিখেছিলেন তিনি। তখন বাজারে কোনো সেলুন ছিল না। খোলা জায়গায়, গাছতলায় বা পুকুরপাড়ে বসেই মানুষের চুল কাটতে হতো। সেই সময় থেকেই শুরু তার পথচলা। মাঝারদিয়া বাজারে সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে। হাটের দিন সকালে ধীর পায়ে বাজারে এসে পুকুরপাড়ে পিঁড়ি পেতে বসেন অকিল শীল। তারপর শুরু হয় তার পরিচিত কাজ—চুল আর দাড়ি কাটা। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও কাজে তার আগ্রহ একটুও কমেনি।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ আলী মাতুব্বর বলেন, ছোটবেলা থেকেই তিনি অকিল শীলের কাছেই চুল কাটান। তার হাতে চুল কাটালে আলাদা একটা ভালো লাগা কাজ করে। আরেক বাসিন্দা সাইদুল জানান, ধনী-গরিব সবার সঙ্গে অকিল শীলের ব্যবহার একই রকম। তার কাছে চুল কাটাতে গেলে যেন পুরোনো দিনের গন্ধ পাওয়া যায়।
অকিল শীল জানান, বর্তমানে তিনি একজনের চুল কাটার জন্য ৫০ টাকা নেন। হাটের দিনে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন গ্রাহক তার কাছে আসেন। সেই সামান্য আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালানোর চেষ্টা করেন। তার পাঁচ ছেলে-মেয়ে থাকলেও কেউ এই পেশায় আসেননি। তবু নিজের ভালোবাসার কাজটি তিনি ছাড়তে পারেননি। আজও হাটের দিনে পুকুরপাড়ে বসে থাকেন অকিল শীল—হাতে কাঁচি আর ক্ষুর। কাঁচির টুংটাং শব্দে যেন ধীরে ধীরে লেখা হয়ে চলে তার ছয় দশকেরও বেশি সময়ের শ্রম, স্মৃতি আর সংগ্রামের গল্প।