ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সংঘাতকে অনেক বিশ্লেষক এমন একটি যুদ্ধ হিসেবে দেখছেন, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। তাদের মতে, ওয়াশিংটন যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে বিপুল অর্থ ও সামরিক শক্তি ব্যয় করছে, তখন চীন নীরবে দীর্ঘমেয়াদি কৌশল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গত ৫ মার্চ ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসে প্রকাশিত চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় এমন একটি উচ্চাভিলাষী প্রযুক্তি ও শিল্প কৌশলের কথা বলা হয়েছে, যা আগামী কয়েক দশকে বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। ১৪১ পৃষ্ঠার এই পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, কোয়ান্টাম যোগাযোগ, মহাকাশ প্রযুক্তি এবং উন্নত শিল্প খাতের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিনিয়োগ বিশ্লেষক শানাকা আনসেলাম পেরেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, এই নথি অনেকটা জাতীয় প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির মতো। তাঁর মতে, বিশ্বের অনেকেই বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন না, অথচ এখানেই ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতার মূল দিকটি লুকিয়ে আছে। পরিকল্পনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আগামী দশকে অর্থনীতির বড় অংশে যুক্ত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি মানবাকৃতির রোবট বা হিউম্যানয়েড রোবোটিকসকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প হিসেবে চিহ্নিত করে এর উৎপাদন পাঁচ বছরের মধ্যে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
চীন একই সঙ্গে মহাকাশভিত্তিক কোয়ান্টাম যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, নিউক্লিয়ার ফিউশন গবেষণায় অগ্রগতি এবং ব্রেইন-কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তি উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এআই–সম্পর্কিত শিল্পগুলোর মূল্য এক দশকের মধ্যে ১০ লাখ কোটি ইউয়ান ছাড়িয়ে যেতে পারে, যা প্রায় ১ লাখ ৪ হাজার কোটি ডলারের সমান।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ২০২২ সালে পাস হওয়া চিপস অ্যান্ড সায়েন্স অ্যাক্টের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে বিনিয়োগ বাড়ালেও সেটি মূলত একটি খাতেই সীমাবদ্ধ। বিপরীতে চীনের কৌশল অনেক বিস্তৃত, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিকস, কাঁচামাল এবং শিল্প উৎপাদনব্যবস্থাকে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। বিশেষ করে বিরল খনিজ উপাদানের ওপর চীনের নিয়ন্ত্রণ এই কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা, রাডার ও ইলেকট্রনিক যন্ত্র তৈরিতে এসব খনিজ অপরিহার্য। বর্তমানে বিশ্বের অধিকাংশ বিরল খনিজ প্রক্রিয়াজাতকরণ চীনের নিয়ন্ত্রণেই রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি চীন কাঁচামাল, প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থাকে একত্রে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে, তবে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বরং সরবরাহ শৃঙ্খল ও শিল্প কারখানার ভেতরেই নির্ধারিত হবে।