লেবাননের দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলসহ রাজধানী বৈরুতের গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে ইসরায়েলি বাহিনীর সাম্প্রতিক ভয়াবহ হামলা ও উচ্ছেদ অভিযানের পর আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই হামলা কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং লেবাননের জনসংখ্যাগত বাস্তবতাকেও বদলে দেওয়ার কৌশল থাকতে পারে এর পেছনে। বিশেষ করে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় দাহিয়েহ এবং বেকা উপত্যকার বাসিন্দাদের এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়াকে অনেকেই একটি পরিকল্পিত পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। এসব অঞ্চল মূলত হিজবুল্লাহর প্রধান সমর্থক গোষ্ঠীর আবাসস্থল। বিশ্লেষকদের মতে, তাদের সরিয়ে দিলে সংগঠনটির সামাজিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। গত কয়েক দিনের টানা হামলায় লেবাননে ইতোমধ্যে চার শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেক পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর হিজবুল্লাহর পাল্টা রকেট হামলাকে কেন্দ্র করেই পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর সীমান্ত এলাকায় বিপুল সেনা ও ট্যাংক মোতায়েন করে ইসরায়েল হিজবুল্লাহর প্রভাববলয় হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলোকে জনশূন্য করার কৌশল নিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
লেবাননের বিশ্লেষক ও লেখক মাইকেল ইয়াংয়ের মতে, এই কৌশলের মাধ্যমে হিজবুল্লাহর ওপর সামাজিক ও রাজনৈতিক চাপ বাড়ানোই ইসরায়েলের মূল উদ্দেশ্য। এতে দীর্ঘমেয়াদে সংগঠনটির প্রতিরোধ সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং ইসরায়েল ওই অঞ্চলে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারবে। এদিকে সাধারণ লেবাননিদের মধ্যে নতুন করে দখলদারত্বের আশঙ্কা বাড়ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ইসরায়েল এবার হয়তো আক্রান্ত অঞ্চলগুলো থেকে দ্রুত সেনা প্রত্যাহার করবে না। বরং ১৯৮২ সালের ঘটনার মতো দীর্ঘ সময় দক্ষিণ লেবানন দখলে রাখার পরিকল্পনাও থাকতে পারে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক রাবিহ দানদাশলি সতর্ক করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী দখলদারত্ব নতুন প্রতিরোধ আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে। অন্যদিকে ইসরায়েল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লেবাননের ওপর কঠোর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শর্ত আরোপের দিকেও যেতে পারে। বর্তমান সংঘাতের কারণে লেবাননের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোও ব্যাপক চাপে পড়েছে। বৈরুতের লেবানিজ আমেরিকান ইউনিভার্সিটির বিশ্লেষক ইমাদ সালামেই মনে করেন, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতির ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে দেশটির রাজনীতি ও অর্থনীতির গতিপথ বদলে দিতে পারে।
যুদ্ধ শেষ হলেও ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনর্গঠন এবং বাস্তুচ্যুত মানুষের স্বাভাবিক জীবনে ফেরা কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন, লাখো মানুষ হয়তো আর কখনো তাদের নিজ ভূমিতে ফিরতে পারবেন না।
সূত্র: আল জাজিরা