বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য চট্টগ্রাম—একসময় ছিল জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এক অনন্য অঞ্চল। কিন্তু এখন সেই বনভূমি হারাচ্ছে তার প্রাণ, আর একের পর এক বিলুপ্তির পথে চলে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, জুম চাষ, ভিনদেশি ফসলের চাষাবাদ এবং বেপরোয়া শিকারের কারণে প্রাকৃতিক বনভূমি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এর ফলে সাম্বার হরিণ, মেঘচিতা, গয়াল, বনরুই, সজারু এবং ধনেশসহ বহু প্রজাতির প্রাণী আজ অস্তিত্ব সংকটে। এক শতাব্দী আগে এই অঞ্চলে ছিল বাঘ, গন্ডার, ভালুক, ময়ূর, বন্য মহিষসহ অসংখ্য বন্যপ্রাণীর বিচরণ। তৎকালীন প্রশাসক আর. এইচ. স্নেইড হাচিনসন তার গবেষণায় এসব প্রাণীর বিস্তারিত বর্ণনা তুলে ধরেছিলেন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই সমৃদ্ধ বনভূমি এখন অনেকটাই বিরান হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক শতাব্দীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে গন্ডার, বর্মি ময়ূর, বন্য মহিষের কিছু প্রজাতি এবং শ্লথ ভালুক সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। তবে আশার খবরও রয়েছে। সাম্প্রতিক কিছু গবেষণায় দুর্গম বনাঞ্চলে সূর্য ভালুক, কালো ভালুক, সাম্বার হরিণ এমনকি বেঙ্গল টাইগারের উপস্থিতির প্রমাণ মিলেছে।
তবুও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক। কারণ বন উজাড় ও অবৈধ শিকারের কারণে এই প্রাণীগুলোর টিকে থাকা দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় এই অঞ্চলে হাতি, হরিণ, বনমোরগ, শিয়াল, ভালুকসহ নানা প্রাণী চোখে পড়ত। এখন সেগুলো প্রায় দেখা যায় না। পাখিদের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। যেখানে আগে পাখির কলতানে সকাল শুরু হতো, এখন সেই সুর অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
হাতির অবস্থাও উদ্বেগজনক। একসময় খাগড়াছড়ির রামগড়ে ২০ থেকে ২৫টি হাতির পাল দেখা যেত। এখন সেখানে তাদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বন বিভাগের তথ্য বলছে, গত ৯ বছরে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলে ১১৪টি হাতির মৃত্যু হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে হত্যা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া এবং দুর্ঘটনা।
এছাড়া বন্যপ্রাণী পাচারও বড় একটি সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হরিণ, টিয়া, ময়না, গুইসাপসহ বিভিন্ন প্রাণী অবৈধভাবে সমতলে পাচার করা হচ্ছে। সম্প্রতি খাগড়াছড়িতে একটি বাগানবাড়ি থেকে কালো ভালুক, মায়া হরিণ ও বানর উদ্ধার করা হয়েছে—যা এই সংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বনভূমি ধ্বংস এবং মানুষের খাদ্য হিসেবে বন্যপ্রাণী ব্যবহারের প্রবণতা এই সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাদের মতে, বন্যপ্রাণী রক্ষায় জরুরি ভিত্তিতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এদিকে, পার্বত্য চট্টগ্রাম জীববৈচিত্র্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হলেও এখনো তিন জেলায় বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত কাঠামোগত ব্যবস্থা নেই। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে সংরক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করার চেষ্টা চলছে।
সবশেষে একটি বিষয় পরিষ্কার—
বন্যপ্রাণী শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম স্তম্ভ।
এখন প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি সময় থাকতে এই প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে পারব,
নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম শুধু বইয়ের পাতায় দেখবে এই হারিয়ে যাওয়া প্রাণীগুলো?
সময় এখনও আছে—কিন্তু সিদ্ধান্ত নিতে হবে এখনই।