প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না, কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস ও সংগ্রামের প্রেরণা

মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দিতে হবে: প্রধান উপদেষ্টা

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: নিউজ ডেস্ক।

আপলোড সময় : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সকাল ৯:২০ সময় , আপডেট সময় : ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, সকাল ৯:২০ সময়
প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, মানুষ চিরকাল বেঁচে থাকে না, কিন্তু একটি জাতির ইতিহাস ও সংগ্রামের প্রেরণা টিকে থাকতে হয় প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। নতুন প্রজন্মকে অবশ্যই জানতে হবে—এই দেশ কোথা থেকে এসেছে, কীভাবে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। তিনি বলেন, যুদ্ধ কেবল একবারই হয় না; সামনে আরও লড়াই আসতে পারে। তাই মহান মুক্তিযুদ্ধকে জাতির চিরন্তন অনুপ্রেরণায় রূপ দিতে হবে।

রোববার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় এসব কথা বলেন তিনি। বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম উপস্থিত ছিলেন। সভায় জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুর রহমান (বীর উত্তম), ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা, মেজর (অব.) সৈয়দ মুনিবুর রহমান, মেজর (অব.) কাইয়ুম খান, সাদেক আহমেদ খান, হাবিবুল আলম (বীর প্রতীক), মেজর (অব.) ফজলুর রহমান (বীর প্রতীক) প্রমুখ।
এছাড়া বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের নেতারাও সভায় অংশ নেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা এবং ভুয়া পরিচয়ধারীদের আলাদা করার বিষয়ে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি মানুষের গভীর শ্রদ্ধাকে পুঁজি করে অতীতে কেউ কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছে। ভবিষ্যতে যাতে আর কেউ এই সুযোগ নিতে না পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। রাজনৈতিক অপব্যবহারের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো একসময় গুরুত্ব হারিয়ে ‘খেলার পুতুলে’ পরিণত হয়েছিল—সেগুলোকে আবার কার্যকর ও সম্মানজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের চেষ্টা চলছে।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাস সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া একটি মহান ও গৌরবের দায়িত্ব। সামনে আর নতুন করে মুক্তিযোদ্ধা খুঁজে পাওয়ার সুযোগ থাকবে না, কিন্তু তাঁদের স্মৃতি সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। এজন্য এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি, যাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাতির জীবনে চিরস্থায়ী হয়ে থাকে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বলেন, অতীত সরকার মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও বাস্তবে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে এবং অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাকে বঞ্চিত করেছে। এতে মুক্তিযোদ্ধারা মানসিকভাবে আহত ও হতাশ ছিলেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এই খাতকে স্বচ্ছ ও জঞ্জালমুক্ত করতে কাজ করছে এবং মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান ও মর্যাদা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ নিয়েছে।

বৈঠকে বীর মুক্তিযোদ্ধারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন, সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন এবং গণভোটের আয়োজনের জন্য প্রধান উপদেষ্টাকে ধন্যবাদ জানান। তারা বলেন, জুলাই সনদ কার্যকর হলে ফ্যাসিবাদ পুনরায় মাথাচাড়া দিতে পারবে না এবং সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক থাকবে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় জুলাই সনদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেও তারা মত দেন। মুক্তিযোদ্ধারা জানান, গণভোটে ‘না’ জয়ী হলে তা দেশের জন্য অকল্যাণকর হবে। তাই ব্যক্তিগতভাবে তারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখবেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, দেশ এখন নির্বাচনের একেবারে কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সংবিধান সংস্কারের যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তা কাজে লাগাতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণে ঐকমত্য কমিশনের কাজ শেষ হয়েছে এবং সংস্কার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, পরিবর্তন ও সংস্কার ছাড়া বারবার একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে হবে, সামনে এগোনো সম্ভব হবে না।

বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের আহ্বায়ক নঈম জাহাঙ্গীর বলেন, আন্তর্জাতিক পরিসরে আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যে কূটনৈতিক বলয় প্রধান উপদেষ্টা তৈরি করেছেন, তার জন্য তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি বলেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং দুর্বল অর্থনীতিকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা প্রশংসনীয়। মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে অপ-রাজনীতির কারণে মুক্তিযোদ্ধারা দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বৈঠকে মুক্তিযোদ্ধারা আক্ষেপ করে জানান, গত ১৬ বছরে তাদের সম্মান এমনভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে যে অনেক সময় পরিচয় দিতেও সংকোচ বোধ করতে হতো। মানুষ প্রশ্ন করত—“আপনি আসল মুক্তিযোদ্ধা, না নকল?”

ক্যাপ্টেন (অব.) নুরুল হুদা বলেন, দীর্ঘ ৫৭ বছরে যে বাকস্বাধীনতা মানুষ পায়নি, বর্তমান সরকার তা ফিরিয়ে দিয়েছে। এখন মানুষ নির্বিঘ্নে কথা বলতে পারছে এবং যোগ্য নেতৃত্ব বেছে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তিনি বলেন, তরুণরা যেমন একাত্তরে যুদ্ধ করেছিল, ঠিক তেমনি চব্বিশে তরুণ প্রজন্ম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। তারা আমাদেরই উত্তরসূরি। একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করানোর অপচেষ্টা প্রতিহত করতে হবে।

সভায় তিনটি সংগঠনের নেতারা তাদের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তারা জানান, মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই এখন প্রধান লক্ষ্য। সারাদেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও স্মারক সংরক্ষণের কাজ চলছে, ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট বাতিল করা হয়েছে এবং কল্যাণ ট্রাস্টের সম্পদ সঠিক ব্যবহারের জন্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অতীতের মতো কেউ যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে ঐক্যবদ্ধ ও সচেতন থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধ সংশ্লিষ্ট সম্পদ ও অর্থ যেন স্মৃতি সংরক্ষণ ও জাতির দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, সে বিষয়ে গুরুত্ব দেন তিনি। তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে যেমন দায়িত্ব পালন করা হবে, তেমনি নাগরিক হিসেবেও সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সরকারে থাকবেন না উল্লেখ করে বলেন, নাগরিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই তিনি ভবিষ্যতেও দেশের পাশে থাকবেন।

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯