রংপুর অঞ্চলে বিষাক্ত মদ ও রেকটিফাইড স্পিরিটে মৃত্যুর ঘটনা থামছেই না। গত পাঁচ বছরে একই অঞ্চলে একই ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৭ জন। ২০২০ সালে যে এলাকায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছিল, সেই একই এলাকায় চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরো সাতজনের মৃত্যু নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে প্রশাসনের ভূমিকা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। ২০২০ সালে রংপুরের পীরগঞ্জ, বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলায় রেকটিফাইড স্পিরিট পানে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়নের নূরুল ইসলাম (৩০) এবং সদর উপজেলার চন্দরপাট ইউনিয়নের সোহরার হোসেন ও মোস্তফা কামাল। একই বছর পীরগঞ্জের সাদুল্যাপুর এলাকার দুলা মিয়া, হরিরাম সাহাপুরের লাল মিয়া, শানেরহাটের আওয়ামী লীগ নেতা সেলিম সরকার এবং কথিত মাদক কারবারি নওশাদসহ মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়। ছয় বছর পর ২০২৬ সালে এসে আবারও সেই একই দৃশ্যপট। বদরগঞ্জ উপজেলায় রেকটিফাইড স্পিরিট পান করে গত তিন দিনে সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী অনেকে অসুস্থ হলেও সামাজিক আতঙ্ক ও পুলিশের ভয়ে গোপনে চিকিৎসা নিচ্ছেন তারা।
গত ১১ জানুয়ারি মধ্যরাতে বদরগঞ্জ উপজেলার শ্যামপুর এলাকায় চিহ্নিত মাদক কারবারি জয়নুল আবেদিনের বাড়ি থেকে স্পিরিট কিনে পান করেন কয়েকজন। এর পরই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন তারা। ওই রাতেই মারা যান গোপালপুর ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামের আলমগীর হোসেন (৪০), পূর্ব শিবপুর গ্রামের সোহেল মিয়া (৩০) এবং রংপুর সদর উপজেলার সাহাপুর গ্রামের জেন্নাত আলী (৪১)।
পরদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মানিক চন্দ্র রায় (৬০) ও আব্দুল মালেক। সবশেষ গতকাল বুধবার (১৪ জানুয়ারি) ভোরে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হৃদরোগ বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অভিযুক্ত মাদক কারবারি হাজতি জয়নুল আবেদিন (৪৬)। রেকটিফাইড স্পিরিট বিক্রির অভিযোগে জয়নুল আবেদিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাকে রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ জেল সুপার (অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত) অভিজিত চৌধুরী জানান, জয়নুল আবেদিনের বিরুদ্ধে মাদক ও হত্যাসহ একাধিক মামলা ছিল।
এদিকে, রাশেদুল ইসলাম (২৫)-এর মৃত্যু ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে রহস্য। পুলিশ বলছে, নগরীর একটি এলাকা থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন না থাকলেও পরিবারের দাবি, রাশেদুল সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলেন। পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানা যাবে। সচেতন মহলের মতে, শুধু গ্রেপ্তার নয়; স্পিরিটের উৎস শনাক্ত, সরবরাহ চেইনে কড়া নজরদারি, স্থানীয় পুলিশ-প্রশাসনের জবাবদিহি এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত না হলে এই মৃত্যু মিছিল থামবে না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, বদরগঞ্জ ও আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে রেকটিফাইড স্পিরিট ও চোলাই মদ বিক্রি হচ্ছে। গোপালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুল আলম বলেন, ‘একাধিকবার প্রশাসনকে জানিয়েছি। কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় আজ এত প্রাণ ঝরছে।’
পুলিশ জানায়, রেকটিফাইড স্পিরিটপানে মৃত্যুর ঘটনায় বদরগঞ্জ ও হাজিরহাট থানায় দুটি মামলা হয়েছে এবং অভিযুক্তের কাছ থেকে ১০ বোতল রেকটিফাইড স্পিরিট উদ্ধার করা হয়েছে। রংপুর সদর কোতোয়ালি থানার ওসি আব্দুর গফুর বলেন, সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল ফোন ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে তদন্ত চলছে।