ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, মহান নেতাদের প্রশংসা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনামূলক প্রচারণায় পরিপূর্ণ উত্তর কোরিয়ার শীর্ষ সংবাদপত্রটিকে দীর্ঘদিন ধরে উস্কানিমূলক বলে ভাবা হতো। এর জেরে দক্ষিণ কোরিয়া তার নাগরিকদের এটি পড়তে নিষেধ করেছিল। তবে দক্ষিণ কোরিয়ার তুলনামূলক শান্ত নীতির প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং এখন পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিচ্ছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি রসিকতা করে বলেন, ‘রোদং সিনমুন’ পড়লে সাধারণ মানুষ যে ‘কমিউনিস্ট হয়ে যাবে’—এমনটি তিনি বিশ্বাস করেন না।
সম্ভাব্য পাঠকদের আর নিজেদের পরিচয় জানাতে বা কেন তারা এটি পড়তে চান, এ বিষয়ে আবেদন জমা দিতে হচ্ছে না। তবে কপিটি দেখতে হলে এখনো তাদের সরকারি গ্রন্থাগারে যেতে হবে। এদিকে, পিয়ংইয়ংয়ের প্রচারমূলক প্রকাশনায় মুক্ত প্রবেশাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার রাজধানী সিউলে জনমত বিভক্ত দেখা গেছে। উত্তর কোরিয়ার সব মিডিয়া সরকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিন করে এবং ‘রোডং সিনমুন’ হলো দমনমূলক শাসক ওয়ার্কার্স পার্টির মুখপত্র।
২২ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পার্ক সি-ওন বলেন, ‘এটা যেন মানুষকে আইএসআইএসের প্রচারপত্র পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার মতো।’ তিনি এখানে ‘জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসআইএসে’র কথাই উল্লেখ করেন। তার ভাষায়, ‘আপনি যদি না চান মানুষ সেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীতে যোগ দিক, তাহলে কখনোই এমনটা করবেন না।’
অন্যদিকে, ৮১ বছর বয়সী হং সে-উং এই পরিবর্তনকে ‘অপ্রীতিকর’ বলে মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, ‘শত্রু দেশের একটি পত্রিকা মানুষকে পড়তে দেওয়া, কিংবা তাদের সেই দিকে উৎসাহিত করার ধারণাটাই ভীষণভাবে অস্বস্তিকর।’ তবে কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষ আদৌ এতোটা আগ্রহ দেখাবে কি না। ২৭ বছর বয়সী স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থী সন ইউ-জিন বলেন, ‘আজকাল অনেকেই তো ছাপা পত্রিকাই পড়েন না। আমার সন্দেহ হয়, তারা আলাদা করে চেষ্টা করে রোদং সিনমুন পড়তে যাবে।’
‘প্রতীকী পরিবর্তন’
দক্ষিণ কোরিয়া এবং পারমাণবিক অস্ত্রধারী উত্তর কোরিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধাবস্থায় লিপ্ত এবং সিউল দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তার কারণে পিয়ংইয়ংয়ের প্রচারণায় সকল প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করেছে।
অনেক বিধিনিষেধ এখনও কার্যকর রয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার আইপি ঠিকানা ব্যবহার করে এখনো উত্তর কোরিয়ার কোনো ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা সম্ভব নয়।
শুক্রবার সিউলের জাতীয় গ্রন্থাগারে, এএফপি সাংবাদিকরা মুষ্টিমেয় কয়েকজনকে রোডং সিনমুনের কপিগুলো উল্টাতে দেখেছেন। এর পৃষ্ঠাগুলো উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের ছবি দিয়ে পূর্ণ, তার নাম সর্বদা মোটা অক্ষরে লেখা থাকে। তবে সিউলের অন্যান্য এলাকায় এএফপি এমন কোনো গ্রন্থাগার খুঁজে পেতে হিমশিম খেয়েছে, যেখানে নতুন নিয়মগুলো বাস্তবে কার্যকর হয়েছে।
উত্তর কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিশেষায়িত ওয়েবসাইট এনকে নিউজ–এর প্রতিষ্ঠাতা চ্যাড ও’ক্যারল বলেন, ‘ব্যবহারিক দিক থেকে দেখলে, এটি আসলে একটি প্রতীকী পরিবর্তন মাত্র।’ তিনি বলেন, এর জন্য সিউলের নিরাপত্তা আইনে রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে।
তিনি বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে উত্তর কোরিয়া নিয়ে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীদের জন্য এসব উপকরণ নিয়ে কাজ করা অনেক সহজ হতো, যদি দক্ষিণ কোরিয়ার সরকার উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওয়েবসাইটগুলোতে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত করত।’ তবে তার মতে, এমন পদক্ষেপ নিতে গেলে সিউলের নিরাপত্তা আইনে রাজনৈতিকভাবে কঠিন পরিবর্তন আনতে হবে।
এদিকে সিউল ঘোষণা দিয়েছে, উত্তর কোরিয়ার তথ্যের ক্ষেত্রে তারা ‘ক্রমাগতভাবে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ’ করবে। বছরের পর বছর ধরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়া দুই কোরিয়ার সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তবে এই পদক্ষেপ একতরফা। উত্তর কোরিয়ার নাগরিকদের জন্য এখনো দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো ধরনের কনটেন্টে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমন কিছু করতে ধরা পড়লে তাদের কঠোর শাস্তির মুখে পড়তে হতে পারে।