একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড নিয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক শামীম উদ্দিন খানের বিতর্কিত মন্তব্যের জেরে তার পদত্যাগ দাবিতে প্রশাসনিক ভবনে তালা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) বেলা সাড়ে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া হয়।
গতকাল বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান বলেন, ‘যে সময় আমি (পাকিস্তানি বাহিনী) দেশ থেকে পালানোর জন্য চেষ্টা করছি, আমি জীবিত থাকব নাকি মৃত থাকব, সে বিষয়ে কোনো ফয়সালা হয়নি, সে সময় পাকিস্তানি যোদ্ধারা বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করবে, এটি আমি মনে করি না, রীতিমতো অবান্তর।’
এ বক্তব্যের প্রতিবাদে সেদিন রাতেই ছাত্রদলসহ চবি শাখা বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল সম্মিলিতভাবে মিছিল-সমাবেশ করে।
আজ সাড়ে ১২টার দিকে উপ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা দেয় শিক্ষার্থীরা। এতে ভেতরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খান, উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন খানসহ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আটকে পড়েন।
বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী চবি শাখার সভাপতি জাকিরুল ইসলাম জসিম বলেন, ‘বুদ্ধিজীবী দিবসের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিনে সেমিনারে দেওয়া এই মন্তব্য আমরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছি। এর প্রতিবাদে গতকালই মিছিল করা হয়েছে।
আজ প্রশাসনিক ভবনে তালা দেওয়া হয়েছে, এবং উপ-উপাচার্য যত দ্রুত পদত্যাগ করবেন, তত দ্রুত এই ভোগান্তির অবসান হবে।’
চবি ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় এবং এটি পরিচালিত হয় এ দেশের সাধারণ মানুষের করের টাকায়, কোনো রাজাকার বা পাকিস্তানিদের টাকায় নয়।’
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘উপ-উপাচার্য মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের বিরুদ্ধে অপতথ্য ছড়িয়েছেন এবং পাকিস্তানি সেনাদের ‘যোদ্ধা’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। যারা মা-বোনের ইজ্জত লুণ্ঠন করেছে এবং বাবা-ভাইদের হত্যা করেছে, তারা কখনোই যোদ্ধা হতে পারে না।
এসব বক্তব্যের জন্য উপ-উপাচার্যকে ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়ে দ্রুত পদত্যাগ করতে হবে।’
চাকসুর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (এজিএস) আইয়ুবুর রহমান তৌফিক বলেন, ‘প্রশাসনের একটা পদে থেকে শামীম স্যারের এ ধরনের বক্তব্য শোভা পায় না। ওই বক্তব্যের পর তিনি ওই পদে থাকার যোগ্য হারিয়েছেন।’
এ বিষয়ে মোবাইল ফোনে উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ ইয়াহইয়া আখতারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘আমি ঢাকায় সেমিনারে আছি। এখন কথা বলা সম্ভব না।
’
আরেক উপ উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমি এ সংক্রান্ত বক্তব্য দিতে রাজি না।’
এদিকে, আজ ১৫ ডিসেম্বর ইতিহাস বিভাগের বিদায় অনুষ্ঠানে উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শামীম উদ্দিন খানের অতিথি হিসেবে থাকার কথা ছিল। তবে গতকালের বিতর্কিত মন্তব্যের জন্য ইতিহাস বিভাগের হৃদয়ে উদীপ্ত ৫৫ ব্যাচ তাকে বর্জন করে বিবৃতি দেয়।
বিবৃতিতে জানানো হয়, যদি উক্ত অনুষ্ঠানে ড. শামীম উদ্দিন খান উপস্থিত থাকেন, তবে ইতিহাস বিভাগের বিদায়ী ব্যাচ হৃদয়ে উদ্দীপ্ত-৫৫ উক্ত অনুষ্ঠান বয়কট করবে। এটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ নয়; বরং মুক্তিযুদ্ধের সত্য, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং ইতিহাসের মর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে আমাদের ন্যায্য ও নৈতিক অবস্থান।