ভারত থেকে বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি চলছিল স্বাভাবিক পর্যায়েই। কিন্তু দেশীয় কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় ভারত থেকে আচমকা পিয়াজ আমদানি বন্ধ করে বাংলাদেশ সরকার। আর এতেই চরম লোকসানে পড়েছে ভারতের পেঁয়াজ রফতানিকারকরা। তারা বলছে বাংলাদেশি ইমপোর্টারদের মৌখিক আশ্বাসে বাংলাদেশে রফতানির উদ্দেশ্যে সীমান্ত এলাকায় পেয়াঁজ মজুদ করেছিল।
ভারতের ঘোজাডাঙ্গা, পেট্রাপোল, মহাদীপুর ও হিলি সীমান্তেই কম করে হলেও মজুদ করা ছিল অন্তত ৩০ হাজার টন পেঁয়াজ। কোটি কোটি রুপি মূল্যের পেঁয়াজে এখন পচন ধরতে শুরু করেছে। ক্ষতি কমাতে বাধ্য হয়ে স্থানীয় বাজারে একবারে কম দামে এই পেয়াঁজ বিক্রি করে দিচ্ছে ভারতীয় এক্সপোর্টাররা।
রোববার (৩০ নভেম্বর) পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার মাহাদীপুর সোনামসজিদ সীমান্তে দেখা যায় এক কেজি পেঁয়াজের দাম মাত্র ২ রুপি। ৫০ কেজির বস্তা মাত্র ১০০ রুপি। যে পেঁয়াজ নাসিক থেকে কেনা হয় প্রতি কেজি ১৬ রুপিতে, ভাড়াসহ খরচ দাঁড়ায় ২২ রুপিতে, সেই পেঁয়াজই কয়েক দিন ধরে জলের দরে বিক্রি করছেন রফতানিকারকরা। মালদার খুচরা বাজারেই পেঁয়াজের দাম ২০-২২ রুপি প্রতি কেজি। ইংরেজ বাজার শহর থেকে মাত্র ৭ কিলোমিটার দূরে মহদিপুরে গেলেই পিঁয়াজ মিলছে দু'টাকা কেজিতে।
বাংলাদেশে রফতানি হঠাৎ করে বন্ধ হওয়ার কারণ বলে জানিয়েছেন রফতানিকারকরা। স্বাভাবিক সময়ে এই মহদিপুর দিয়ে প্রতিদিন ৩০-৩৫ ট্রাক পেঁয়াজ যেত বাংলাদেশে। সেই আশায় শুধুমাত্র এই সীমান্ত এলাকাতেই ভারতীয় ব্যবসায়ীরা মজুদ পড়েছিল প্রায় কুড়ি হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ। কেজিপ্রতি দাম পড়েছিল প্রায় ২২ রুপি। বাংলাদেশে পেঁয়াজ রফতানি হলে তারা দাম পেতেন কিলো প্রতি ৩০ থেকে ৩২ রুপি। কেজিপ্রতি লাভ হতো ৮ থেকে ১০ রুপি। এতে কারও ক্ষতির পরিমাণ ৬০ লাখ কারও বা কোটি রুপি ! একই ছবি হিলি, পেট্রাপোল ও ঘোজাডাঙ্গা সীমান্তেও।
ব্যবসায়ীরা বলছেন নভেম্বর মাসের ১৬ তারিখ বাংলাদেশের আমদানি–রফতানিকারক গ্রুপ এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, কিছুদিন ধরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর ভারতীয় পেঁয়াজের ইমপোর্ট পারমিট (আইপি) নিয়ন্ত্রণ করছে। প্রথমে কিছু আমদানিকারককে ৫০ টন, পরে আরও কয়েকজনকে ৩০ টন করে আইপি দেওয়া হয়েছিল। দেশীয় কৃষকদের স্বার্থ এর কিছু পরেই পেঁয়াজ আমদানির গোটা প্রক্রিয়ায় আচমকা থামিয়ে দেয় বাংলাদেশ সরকার।
ব্যবসায়ী সাজিরুল শেখ বলেন আমরা কেউ ৫০ গাড়ি আবার কেউ ৭০ গাড়ি পেঁয়াজ নাসিক ও ইন্দোর থেকে কিনে মালদায় নিজেদের গোডাউনে রেখেছিলাম। বড় লরিতে পেঁয়াজ নিয়ে আসা হয়েছিল। ২২ রুপি কেজি দরে এক টনের দাম ২২০০ রুপি। কিন্তু এখন সেই পেঁয়াজে পচন ধরতে শুরু করেছে। তাই বাধ্য হয়ে ২, ৬, ৮, ১০ রুপি কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। একদম ভালো মানের পেঁয়াজ দশ রুপি, আরেকটু কম গ্রেডের পিয়াজ ছয় রুপি, একেবারে তিন নম্বর গ্রেডের পিয়াজ যেগুলো খুব তাড়াতাড়ি পচে যাবে সেগুলো ২রুপি কেজিতেই দিয়ে দিচ্ছি।
আরেক ব্যবসায়ী জাকিরুল ইসলাম বলেন, ব্যাঙ্গালোর থেকে ২৩ রুপি কেজি দরে আমি প্রায় দেড় হাজার টন পেঁয়াজ নিয়ে এসেছিলাম। স্থানীয়ভাবে লেবার চার্জ পড়েছিল প্রায় এক রুপি। সবমিলিয়ে ২৪ রুপি খরচ পড়েছিল। যখন এক্সপোর্ট স্বাভাবিক ছিল দুই মাস আগেও আমিও ৩০-৩৫ গাড়ি পেঁয়াজ রফতানি করেছিলাম। কিন্তু এক্সপোর্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আমাদের এই স্টক পচে যেতে শুরু করেছে। তাই দেরি না করে সেই পিয়াজ ড্রেসিং করে যা দাম পাই তাতেই স্থানীয় বাজারে বিক্রি করতে শুরু করেছি।
এখন দেখার ভারতীয় ব্যবসায়ীদের পেঁয়াজ ব্যবসায় লোকসানের ভর্তুকি কীভাবে তারা মেটান। তবে আগামী দুই মাসের মধ্যে আবার নতুন পেঁয়াজ যখন বাজারে উঠবে তখন পেঁয়াজ ব্যবসা ব্যাপক ধসের সম্মুখীন হবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।