ভয়ঙ্করভাবে আসক্তি বাড়ছে অনলাইন জুয়ায়। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া ছাত্র থেকে শুরু করে নানা শ্রেণী পেশার মানুষ এ জুয়ায়

ভয়ঙ্কর আসক্তি জুয়ার অ্যাপে, পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকা

নিউজটি প্রতিবেদন করেছেন: বাংলা নিউজ নেটওয়ার্ক ডেস্ক।

আপলোড সময় : ২ অক্টোবর ২০২৩, দুপুর ৪:৯ সময় , আপডেট সময় : ২ অক্টোবর ২০২৩, দুপুর ৪:৯ সময়
ভয়ঙ্করভাবে আসক্তি বাড়ছে অনলাইন জুয়ায়। স্কুল, কলেজ পড়ুয়া ছাত্র থেকে শুরু করে নানা শ্রেণী পেশার মানুষ এ জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে করে সর্বশান্ত হচ্ছে তারা। পুলিশের নিয়মিত অভিযানে জুয়ার সাইটগুলোর দেশীয় এজেন্ট গ্রেপ্তার হলেও এর প্রভাব কিছুতেই কমছেনা। বরং দিন দিন তা বেড়েই চলেছে। বিশেষ করে জুয়ার এ টাকার বড় অংশই পাচার হয়ে যাচ্ছে। 

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আজাদ রহমান বলেন, অনলাইন জুয়ার বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে। জুয়ার সাইটগুলোর এজেন্টদের আমরা প্রতিনিয়ত গ্রেপ্তার করে যাচ্ছি। এরপরও সিন্ডিকেটেরা তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছে। আমাদের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এ বিষয়ে কাজ করে যাচ্ছে।  

কাউন্টার টেরোরিজম এ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসির) সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগের এডিসি নাজমুল ইসলাম বলেন, অনেক সাইট-ই আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। এরই মধ্যে এ অপরাধের দায়ে অনেককেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অনলাইন জুয়া প্রতিরোধ বিষয়ক একটি আইন করার প্রস্তুতি চলছে। আইন হয়ে গেলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে আরো ভালোভাবে কাজ করা যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জুয়ার অনলাইন অ্যাপগুলোর টার্গেট থাকে মূলত দেশের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ শিক্ষার্থী ও বেকার জনগোষ্ঠীর ওপর। দেশ জুড়ে রয়েছে এদের বিশাল এজেন্ট। এসব এজেন্টের কাজ হলো সাইটে কাজের জন্য গ্রাহক জোগাড় করা। জুয়া খেলার জন্য প্রতি গ্রাহক যে পরিমাণ টাকা প্রদান করেন এবং তার লাভের ওপর নির্দিষ্ট অংশ এজেন্টরা কমিশন হিসেবে পেয়ে থাকেন। যখন এমন জুয়ার অ্যাপের কথা এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে, তখন এজেন্টকে আর তেমন কাজ করতে হয় না। কারণ মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে জুয়া খেলার অ্যাপটির কথা। অ্যাকাউন্ট খুললেই লাখ লাখ টাকা ইনকাম করার সুযোগ ছড়িয়ে পড়লে তাতেই আসক্তি বেড়ে যায়।  

দেশের তরুণ যুবকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে এভাবে দেশের কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হচ্ছে।

জানা যায়, প্রথম দিকে বাজির টাকায় যখন দুই তিন গুণ টাকা ফেরত আসে, তখন বাড়তে থাকে লোভ। যেভাবেই হোক আরো টাকা জোগাড় করে আবার ধরা হয় বাজি। কিন্তু হেরে গেলে সব টাকাই জলে! তখন টাকা উদ্ধারের জন্য ফের টাকা জোগাড় করে বাজি ধরার চক্রে পড়ে নিঃস্ব হতে হয়। 

রাজধানীর বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রহমান। পেশায় ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু ক্রিকেট বেটিং অ্যাপের জুয়ার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত। আব্দুর রহমান এখন ছোট চায়ের দোকান দিয়ে কোনমতে জীবন চালাচ্ছেন।

রহমানের মতো বনশ্রীর অন্তত শতাধিক ব্যক্তি জুয়ার ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হয়েছে। আর এটি যদি পুরো রাজধানীজুড়ে হিসেবে করা যায় তবে কয়েক লাখে পৌঁছাবে। বেটিং অ্যাপে জুয়ার ফাঁদ যে শুধু শহরকেন্দ্রিক তা নয়, শহর ছাপিয়ে তা এখন দেশের আনাচে-কানাচে। জুয়ার এ ফাঁদে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ।  

অনুসন্ধানে জানা যায়, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন লীগ খেলা ও মোবাইল গেমকে কেন্দ্র করে বেটিং তথা বাজি ধরা সবচেয়ে বেশি চলে। আয়োজকের ভূমিকায় থাকে একটি ওয়েবসাইট। সাইটগুলো নেট দুনিয়ায় ‘বেটিং সাইট’ নামে পরিচিত। দেশে-বিদেশি বিভিন্ন নামে বেটিং সাইট রয়েছে। ওই সাইটগুলোতে প্রথমে অ্যাকাউন্ট খুলে নিবন্ধিত হতে হয়। তারপর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য কার্ড বা অন্য কোনো মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে জুয়ায় অংশ নিতে হয়। পরে একটি চক্রের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা নিয়ে তা ডলারে রূপান্তরিত করে জুয়াড়িদের অ্যাকাউন্টে জমা করে। অনলাইন জুয়াড়িরা বিকাশ, রকেট, নগদসহ বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা আদান-প্রদান করে থাকে।  

সিআইডি সূত্র জানায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর অনলাইন জুয়া পরিচালনাকরী চক্রের অন্যতম মূল হোতা মো. মতিউর রহমানকে ঢাকা থেকে নেপালের কাঠমুন্ডু যাওয়ার পথে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হতে গ্রেফতার করা হয়। 

এর আগে গত ৩১ আগষ্ট অনলাইন প্লাটফর্ম মেলবেট, ওয়ানএক্সবিট, গেস বেট উইনার নামের বেটিং সাইটসমূহে জুয়া পরিচালনাকারী চক্রের ৬ সদস্যকে  গ্রেফতার করা হয়। ওই সময় মতিউরকে গ্রেফতার করা যায়নি। মূলত তাদের দেয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই মতিউরকে গ্রেপ্তার করা হয়।     

মতিউরকে জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে সিআইডি জানায়, সে ২০১৭ সালে পড়াশোনা করার জন্য রাশিয়ায় যায়, সেখানে  সে গ্রাজুয়েশন সম্পুর্ন করে বর্তমানে সোস্যাল ওয়ার্কে মাস্টার্স করছে। সে ২০২১ সালে ওয়ান এক্সবিট উইনারের সাথে যুক্ত হয়। সে ৫০০০ ডলার সিকিউরিটি মানি দিয়ে বেট উইনার এবং ৩০০০ ডলার সিকিউরিটি মানি দিয়ে ইবঃরিহহবৎ এর এজেন্টশীপ গ্রহণ করে। বাংলাদেশে জুয়ার সাইট পরিচালনা করার জন্য ৬ জনের সহায়তায় একটি চক্র গড়ে তুলে। চক্রের সদস্যদের মধ্যে সৈকত রানা, সাদিকুলসহ আরো কয়েকজন তাদের এম এফ এস এজেন্ট নম্বর গুলো ব্যবাহার করে টাকা লেনদেন করতো। বেটিং সাইট কর্তৃপক্ষ চক্রের আরেক সদস্য মতিউর’কে  প্রদান করতো। পরবর্তীতে সকল এজেন্ট দের কাছ থেকে সংগৃহীত টাকা সৈকত ও মতিউর  যৌথভাবে পাঠিয়ে দিত। এভাবে তারা প্রতিমাসে বিপুল পরিমান টাকা হুন্ডি করে দেশের বাইরে পাচার করেছে বলে জানা যায় ।

জানা যায়, দেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় অনলাইন জুয়ার সাইট ওয়ানএক্সবেট। এছাড়া ওয়ানএক্সবিট, বেট ৩৬৫ ডটকম, প্লেবেট ৩৬৫ ডটকম, বিডিটি ১০ ডটকম, উইনস ৬৫ ডটকম ও বেটস্কোর ২৪ ডটকম, মেলবেট, প্যারিম্যাচ সাইটও বেশ জনপ্রিয়। এরমধ্যে বেট ৩৬৫ ডটকমের বিশ্বজুড়ে গ্রাহকসংখ্যা দেড় কোটি। এগুলোর বিজ্ঞাপন নিয়মিত দেওয়া হয় ফেসবুকে। দেশের বাইরে থেকে পরিচালিত এ সাইটগুলোতে ফুটবল, ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলা নিয়ে বাজি ধরা যায়। ক্রিকেটে প্রতি বলে বলে, ম্যাচের প্রথম ওভারের প্রথম বলে, প্রতি ওভারে, প্রতি ম্যাচের প্রথম ছয় ওভার, পরবর্তী ওভারে উইকেট যাবে কি না ও কোন দল জিতবে এমন করে জুয়ার ক্যাটাগরি সাজানো। এসব সাইটের বেশিরভাগ রাশিয়াকেন্দ্রিক। তবে ভারত ও পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশ থেকেও এগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়। কিছু দেশী সাইটও রয়েছে। 

সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক থেকে অনলাইন জুয়ার ৩৩১টি ওয়েবসাইট বন্ধ করে দিয়েছে টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি। গুগল প্লে স্টোর থেকে জুয়া বিষয়ক অ্যাপ বন্ধের জন্য গুগল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে রিপোর্ট করেছে বিটিআরসি। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি অ্যাপ বন্ধ হয়ে  গেছে, বাকিগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে। অনলাইন জুয়া বন্ধে যতটা সম্ভব, চেষ্টা করা হচ্ছে।

কিন্তু সমস্যা হলো, সাইটগুলো পরিচালিত হয় বিদেশ থেকে। দেশে বন্ধ করা হলে ভিপিএন বা অন্য উপায়ে ঠিকই সাইট ব্যবহার করা হচ্ছে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো-ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যমে অনলাইন জুয়ার বিজ্ঞাপন চলছে। এজন্য জনসচেতনতার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে বলে পরামর্শ দেন তিনি।

এদিকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার মশিউর রহমান বলেন, আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। দ্রুত এ বিষয়ে রেজাল্ট আসবে। জুয়ার মূলহোতাদের গ্রেপ্তারে কাজ করছে গোয়েন্দা বিভাগ।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, অন্যান্য সংস্থার ন্যায় আমরাও মনিটরিং করছি। এ চক্রকে আমরা মাঝেমধ্যে গ্রেপ্তারও করছি। আমাদের নজরদারী চলমান রয়েছে। 

সম্পাদকীয় :

সম্পাদকঃ মো: ফারুক হোসেইন,

এক্সিকিউটিভ এডিটরঃ ড. আব্দুর রহিম খান,

প্রকাশকঃ মো: মতিউর রহমান।


অফিস :

অফিস : রুপায়ন জেড. আর প্লাজা (৯তলা), প্লট- ৪৬,রোড নং- ৯/এ, সাতমসজিদ রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা- ১২০৯।

ইমেইল : info@banglann.com.bd, banglanewsnetwork@gmail.com

মোবাইল : +৮৮ ০২ ২২২২৪৬৯১৮, ০২২২২২৪৬৪৪৯